ফের নাসিকে মুসলিম যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলল হিন্দুত্ববাদী ‘গোরক্ষক’রা

 

মহারাষ্ট্রের নাসিকে ফের মুসলিম সম্প্রদায়ের এক নিরীহ যুবককে পিটিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে খুন করল আরএসএস-বিজেপি’র মদতপুষ্ট স্বঘোষিত ‘গোরক্ষক’রা। তাদের হিংস্র আক্রমণে গুরুতর জখম হয়েছেন আরও এক তরুণ। জানা গিয়েছে, আক্রান্ত যুবকরা শনিবার বিকালে একটি গাড়ি করে মাংস নিয়ে যাচ্ছিল। সেগুলি গোরুর মাংস সন্দেহ করে ইগাতপুরী এলাকার ঘোতি-সিন্নার সড়কের ওপর গাড়ি থেকে টেনে নামানো হয় ওই দুই যুবককে। তারপরে একটানা চলতে থাকে বেদম প্রহার। মারের চোটে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান একজন। অপরজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সোমবার পুলিশ সূত্রে এখবর দেওয়া হয়েছে।
দিন পনেরোর মধ্যে নাসিকে পিটিয়ে হত্যার এই নিয়ে দু’টি ঘটনা ঘটল। এর আগে গত ৮ জুন টেম্পোগাড়ি করে গবাদি পশু পরিবহণের সময়ে তিনজন মুসলিম যুবককে বেপরোয়া মারধর করে ‘গোরক্ষক’রা। আক্রান্ত তিনজনের মধ্যে লোকমান আনসারির (২৩) দেহ দু’দিন পরে ইগাতপুরীর একটি খাল থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোট যত এগিয়ে আসছে, বিজেপি জোট শাসিত মহারাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাও বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি আকোলা, আওরঙ্গাবাদ, আহমেদনগর, কোলাপুরে সাম্প্রদায়িক গোলমালের পরে এবার পিটিয়ে হত্যার পরপর দু’টি ঘটনায় নাসিকেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

নাসিকের সর্বশেষ ঘটনাটির বিবরণ দিয়ে পুলিশ জানায়, গত শনিবার বিকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মুম্বাই থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে ইগাতপুরী এলাকায় গম্ভীরওয়াদির কাছে ঘোতি-সিন্নার সড়কের ওপর একটি গাড়ি আটকায় ১৫-২০জন যুবকের একটি দল। ওই গাড়িতে করে আহমেদনগর থেকে ৪৫০কিলোগ্রাম মাংস নিয়ে মুম্বাই যাচ্ছিল আফান আনসারি (৩২) এবং নাসির কুরেশি (২৪)। এই দু’জনেরই বাড়ি মুম্বাইয়ের কুরলায়। যারা গাড়ি আটকায় তারা নিজেদের ‘গোরক্ষক’ বলে পরিচয় দিয়ে দাবি করে, এই গাড়িতে গোরুর মাংস ‘পাচার’ করা হচ্ছে। এরপরেই গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে আফান এবং নাসিরের ওপর স্টিলের রড এবং লাঠি দিয়ে যথেচ্ছ মারধর শুরু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আফান এবং নাসিরকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে আফানকে ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।

নাসিক গ্রামীণ পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট শাহজি উমাপ জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাসিরের অভিযোগের ভিত্তিতে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঘোতি থানার পুলিশ। ধৃতদের মোবাইল ফোনের লোকেশন এবং ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে ঘটনায় তারা যুক্ত কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গাড়িতে রাখা মাংসের নমুনা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ওই মাংস গোরুর না মোষের, তা জানাবেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। পুরো ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
মাত্র পনেরো দিন আগে এই নাসিক জেলার ইগাতপুরীতেই টেম্পো করে গবাদি পশু নিয়ে যাওয়ার সময় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিন যুবক। আক্রমণকারীদের বেদম প্রহারে প্রাণ হারান মুসলিম সম্প্রদায়ের যুবক লোকমান আনসারি। সেই ঘটনায় পুলিশ ৬ জনকে গ্রেপ্তারের পর জানা যায়, হামলাকারীরা সকলেই হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় বজরঙ দলের সদস্য ও কর্মী।

নাসিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর পরপর প্রাণঘাতী হামলা হওয়ায় জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষোভ ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ‘গোরক্ষক’ নাম নিয়ে একদল লোকের এহেন উন্মত্ত হামলা এখনই বন্ধের দাবি তুলেছে ফেডারেশন অব মহারাষ্ট্র মুসলিমস। সংগঠনের তরফে এক বিবৃতিতে হামলা এবং খুনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা দেবেন্দ্র ফড়নবিশের কাছে দাবি জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, শিবসেনার একদল বিধায়ক ভাঙিয়ে এনে তাদের নেতা একনাথ শিন্ডকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে বর্তমানে মহারাষ্ট্রে সরকার চালাচ্ছে বিজেপি। এই সরকারের আমলে একতরফা সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনাও যথারীতি বেড়ে চলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে আকোলা, আওরঙ্গাবাদ, আহমেদনগর, কোলাপুরে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সইতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। এবার নতুন করে গোলমালের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে নাসিকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি ও গোলমালের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের গোপন কর্মসূচির সঙ্গেই নির্বাচনী মেরুকরণের রাজনীতিও সরাসরি যুক্ত। বিশেষত বিজেপি’র চিরাচরিত ঘাঁটি কসবা পেথ বিধানসভা কেন্দ্রের সাম্প্রতিক উপনির্বাচনে জোর ধাক্কা খেয়েছে তারা। দীর্ঘদিন ধরে এই আসন বিজেপি’র দখলে থাকলেও কিছুদিন আগেই কংগ্রেস প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটে হেরেছে তারা। কেন্দ্রের শাসকদলের রথী-মহারথীদের বারংবার প্রচারও কোনও কাজে আসেনি সেখানে। এই অবস্থায় ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আরও তীব্র করার চেষ্টায় মহারাষ্ট্রে অশান্তি ও হিংসার আবহ তৈরি করবে বিজেপি-আরএসএস, মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

লোকসভা নির্বাচনে মহারাষ্ট্রের গুরুত্ব মনে করিয়ে দিয়ে বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, সংসদের নিম্নকক্ষে দ্বিতীয় সর্বাধিক আসন রয়েছে এই রাজ্যটির। উত্তর প্রদেশের ৮০ টি লোকসভা আসনের পরেই রয়েছে মহারাষ্ট্র। মহারাষ্ট্রে রয়েছে ৪৮ টি আসন। বর্তমানে এই দুই রাজ্যই বিজেপি-শাসিত। সুতরাং আগামীবার কেন্দ্রে কারা সরকার গড়বে, তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে মহারাষ্ট্রের আসনগুলি। সেদিকে তাকিয়েই এরাজ্যে নতুন করে সাম্প্রদায়িক অশান্তি বাধানোর উসকানি চলছে বলেই মনে করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে এনসিপি’র প্রবীণ নেতা শারদ পাওয়ারও বলেছিলেন, ‘‘রাজ্যজুড়ে সাম্প্রদায়িক গোলমাল তৈরির ছক কষা হচ্ছে।’’ দলীয় কর্মীদের সতর্ক করে তিনি বলেছিলেন, ‘‘যেখানেই বিজেপি দুর্বল, সেসব এলাকায় রাজনৈতিক মুনাফার খোঁজে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর ফিকির খুঁজবে ওরা। আইন শৃঙ্খলা রসাতলে গেলে সাধারণ মানুষকেই ফল ভুগতে হবে।’’ (সৌজন্যে: গণশক্তি অনলাইন)

সর্বশেষ সংবাদ

জনপ্রিয় গল্প

সর্বশেষ ভিডিও