সুদ, মদ, জুয়া ও ঘুষ মুক্ত সমাজ গড়তে কলকাতায় ওয়েলফেয়ার পার্টির আলোচনা সভা

মুদাসসির নিয়াজ

ওয়েলফেয়ার পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির তরফে “সুদ মুক্ত অর্থনীতি, মদ মুক্ত দেশ, জুয়া মুক্ত জনজীবন, ঘুষ মুক্ত পরিবেশ” গড়ার লক্ষ্যে রাজ্যব্যাপী বিক্ষোভ অভিযান চলছে। তারই অংশ হিসেবে আজ শনিবার ১৮ নভেম্বর কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস সভাঘরে বিভিন্ন সংগঠনকে নিয়ে এক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হল। উপস্থিত ছিলেন ওয়েলফেয়ার পার্টির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ডা. রইসুদ্দিন সাহেব, রাজ্য সভাপতি মনসা সেন, রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সারওয়ার হাসান, শরদিন্দু বিশ্বাস, মজলিসে মুশাওয়ারাত-এর আব্দুল আজীজ, সংবিধান বাঁচাও কমিটির সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস, ভাষা ও চেতনা সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ইমানুল হক, জৈন ধর্মের প্রতিনিধি ড. নম্রতা কোঠারী, বৌদ্ধ প্রতিনিধি অরুণজ্যোতি ভিক্ষু, সদভাবনা মঞ্চের আহ্বায়ক মুহাম্মদ তাহেরুদ্দিন, ঐকতান মিল্লি পরিষদের আহ্বায়ক আমিনুল আম্বিয়া ও আবু ওয়াহিদা, ইমাম পরিষদের নেতা নিযামুদ্দিন বিশ্বাস প্রমুখ।
বিশেষ করে মদ ও সুদ মুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে আমন্ত্রিতদের বক্তব্যে নানা দিক উঠে আসে। আব্দুল আজীজ সাহেব বলেন, সরকার মদকে নিষিদ্ধ করতে চায় না। কারণ, রাজনীতি থেকে গণমাধ্যম, কর্পোরেট থেকে প্রতিরক্ষা, পর্যটন সর্বত্র মদের রমরমা। সরকারের সাফাই হল, মদ নিষিদ্ধ হলে রাজকোষে ঘাটতি দেখা দেবে। কিন্তু সদিচ্ছা থাকলে সরকার বিকল্প আয়ের উৎস খুঁজতে পারে, তা কিন্তু করছে না, করবেও না। পুঁজিবাদী অর্থনীতির চালিকাশক্তি হল মদ ও সুদ। সোশ্যার স্ট্যাটাস সিম্বলে পরিণত হয়েছে মদ। আর সুদ হল পুঁজিবাদী শোষণমূলক অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
ওয়েলফেয়ার পার্টির রাজ্য সভাপতি মনসা সেন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নেতা-কর্মী তৈরি করছে রাজনৈতিক স্বার্থে শুধুমাত্র ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে। তাই তারা তাদের দলীয় কর্মীদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা দিচ্ছে না। ফলে রাজনৈতিক পরিবেশ ও সংস্কৃতি রসাতলে চলে যাচ্ছে। দেশবাসীর মৌলিক সমস্যার সমাধান না করে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পথে এগোচ্ছে সব দল। রাজনীতি ক্রমেই পুঁজিবাদের পথযাত্রী হচ্ছে। সুদ আর মদ হল পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূল কথা। অর্থনীতিকে সুষম ও পুষ্ট করতে হলে সুদবিহীন ও মদমুক্ত সমাজ-জাতি গড়তে হবে। সুদ হল শোষণের হাতিয়ার। আর মূল্যবোধভিত্তিক রাজনৈতিক দল ওয়েলফেয়ার পার্টির লড়াই হল পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও শোষণের বিরুদ্ধে।
তাঁর মতে, মদের কারণে সবথেকে বেশি ক্ষতি হচ্ছে নারী, শিশু ও যুবসমাজের। সর্বোপরি মদ, সুদ, ঘুস ও জুয়া-লটারীর কারণে আপূরণীয ক্ষতির শিকার হচ্ছে মানব সম্পদ। অথচ আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান বিশ্বগুরু হবার স্বপ্ন দেখছেন। আর দেশের ৬৫ শতাংশ যুব সমাজ মদ, সুদ, ঘুস ও জুয়ার অক্টোপাশে জড়িয়ে পড়ছে। ধনবৈষম্য ঘোচাতে হলে অবিলম্বে এসব অভিশপ্ত জিনিসকে বন্ধ করতে হবে। তিনি এও বলেন, ওয়েলফেয়ার পার্টি রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির অংক দেখে না। সমাজ ও দেশবাসীকে সর্বাত্মক ইনসাফ ও অধিকার পাইয়ে দিতে চাই আমরা।
সুকৃতিরঞ্জন বিশ্বাস বলেন, মদ, সুদ, ঘুস, জুয়া এগুলো সামাজিক ব্যাধি বা অভিশাপ হলেও এগুলোর সঙ্গে রাজনীতির গভীর ও নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। এগুলোই দেশের চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাই নৈতিক সংকট ও সামাজিক অবক্ষয় এতটা গভীরে পৌঁছে গেছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। সমস্ত অশুভের শিকড় নিহিত সুদ ও মদের মধ্যে। রাজনৈতিক দলগুলো ভোট, ক্ষমতা আর গদির লড়াইয়ে মত্ত। সমাজ সংস্কারের ভাবনা তাদের নেই। ওয়েলফেয়ার পার্টি এগুলোকে তাদের দলীয় অ্যাজেন্ডায় স্থান দেওয়ায় মূল্যবোধভিত্তিক এই দলকে সাধুবাদ জানান তিনি।
অধ্যাপক ইমানুল হক বলেন, মদ-সুদ-ঘুস থেকে সমাজকে মুক্ত করতে ওয়েলফেয়ার পার্টির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই ও সমর্থন করি। এসবের কারণেই স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও দেশের সবথেকে বড় ব্যাধি হিসেবে রয়ে গেছে দারিদ্র্যতা। আর সবথেকে বড় সামাজিক ব্যাধি হল কর্পোরেট ফ্যাসিবাদ। মদ বিক্রি থেকে সবথেকে বেশি রাজস্ব আদায় হয় উত্তরপ্রদেশে ৩২ শতাংশ। তাঁর কথায়, রাজনীতি আর দুর্নীতি একই মুদ্রার দুই পিঠ। দুর্নীতি আর ফ্যাসিবাদী নীতিই এখন সব দলের অঘোষিত নীতি। ফ্যাসিবাদ হল আমাদের সামনে সবথেকে বড় বিপদ।
মুহা. তাহেরুদ্দিন বলেন, সুদ ও মদ-মুক্ত সমাজ গড়ার ভাবনা যেন আকাশ কুসুম কল্পনা। কারণ, দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এগুলোকে এতটাই একাত্ম করে দেওয়া হয়েছে যে, সাধারণ মানুষ মদ ও সুদ-ঘুস বিহীন সমাজের কথা ভাবতেই পারে না। প্রকাশ্য রাস্তায় মদের বিশাল বিশাল হোর্ডিং, ব্যানার। এমনকী বিশ্বকাপকেও স্পনসর করে মদ কোম্পানিগুলো। একইভাবে সুদ ছাড়া কোথাও থেকে টাকা ধার বা ঋণ পাওয়া সম্ভব বলে মানুষ ভাবতেই পারে না। এবং ঘুস ছাড়া কোনও কাজ উদ্ধার হতে পারে বলেও ভাবাটা বাতুলতা মাত্র। তাই সদভাবনা মঞ্চের তরফে সুষম সমাজ বিনির্মাণে ওয়েলফেয়ার পার্টির এই ব্যতিক্রমী ভাবনাকে আন্তরিকভাবে সমর্থন জানান তিনি।
আমিনুল আম্বিয়া বলেন, দুনিয়াবী স্বার্থে মানুষ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়। সরকারি উদ্যোগে মদের দোকান খোলা হচ্ছে, মদের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে, এমনকি দুয়ারে মদ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে স্রোতের প্রতিকূলে গিয়ে সমাজকল্যাণ ও জনকল্যাণে ওয়েলফেয়ার পার্টি সুদ, ঘুস, মদ, জুয়া মুক্ত সমাজ ও দেশ গড়ার আহ্বান জানানোয় তাদের ভাবনাকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারছি না। যাদেরকে মূলস্রোতের রাজনৈতিক দল বলা হচ্ছে তাদের সঙ্গে এই মূল্যবোধযুক্ত পার্টির তফাতটা মানুষকে বোঝাতে হবে। ওয়েলফেয়ার পার্টির লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, নীতি, আদর্শ সবাইকে জানাতে হবে এবং তার ভিত্তিতে জনমত গঠন করতে হবে।
ওয়েলফেয়ার পার্টির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি ডা. রইসুদ্দিন সাহেব বলেন, কোনও রাজনৈতিক দল তাদের এজেন্ডা বা ম্যানিফেস্টোতে সুদ, ঘুস, মদ, জুয়া নিষিদ্ধের বিষয়টা রাখেনি। তাই এগুলো বন্ধ হয়নি; বরং এদের দাপট ও রমরমা দেশজুড়ে। অথচ তারা নন-ইস্যুকে ইস্যু করে দেশ তোলপাড় করছে। সামাজিক বিভাজন, মেরুকরণ, অসহিষ্ণুতার বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। তাই ওয়েলফেয়ার পার্টি তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডায় মদ, সুদ, ঘুস, জুয়া, লটারী ইত্যাদি নিষিদ্ধের দাবি রেখেছে। আলেম, ওলামারা এসবের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেন। কিন্তু অরাজনৈতিক মঞ্চ থেকে এই আওয়াজ ওঠানো হয় বলে রাজনীতিতে আসর করে না। তাই ওয়েলফেয়ার পার্টি রাজনৈতিকভাবে এগুলো বন্ধের দাবিতে সরব হয়েছে। রাজ্য তথা দেশজুড়ে বারে বারে আওয়াজ তুলে আন্দোলন, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ চালাচ্ছে।
তাঁর কথায়, এগুলো শুধু সামাজিক ব্যাধি বা অভিশাপ নয়; এসব হল মানবতার শত্রু। এগুলো সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও ধ্বংসের হাতিয়ার। নৈতিক ভিত্তি না থাকলে রাজনীতি হতে পারে না। আর নৈতিকতা বিবর্জিত রাজনীতি কখনও রাজধর্ম পালন করতে পারে না। এধরনের ক্ষমতালিপ্সু রাজনীতি দেশ ও দশের কল্যাণ করতে পারে না। ইস্যুভিত্তিক এবং মূল্যবোধভিত্তিক রাজনীতির তফাৎ এটাই। সবশেষে আগামী ১১ ডিসেম্বর কলকাতার রানী রাসমনি রোডে ওয়েলফেয়ার পার্টির কেন্দ্রীয় সমাবেশে সকলকে যোগদানের আহ্বানও জানান তিনি।
আজকের আলোচনাসভা সঞ্চালনা করেন ওয়েলফেয়ার পার্টির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সারওয়ার হাসান। সবশেষে সভায় গৃহীত রেজল্যুশন পাঠ করে শোনান তিনি।

সর্বশেষ সংবাদ

জনপ্রিয় গল্প

সর্বশেষ ভিডিও