শাস্তি: মৃত্যু

 

রবিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৬। হাওড়া স্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে সেকেন্দ্রাবাদ-হাওড়া ডাউন ফলকনামা এক্সপ্রেস। ট্রেন খালি হয়ে যাওয়ার পর শুরু হয়েছে সাফাইয়ের কাজ। সাধারণ শ্রেণীর একটি কামরায় সিটের নীচে ব্যাগ খুঁজে পান সাফাইকর্মীরাই। নতুন কিছু নয়, ট্রেন থেকে প্রায়শই উদ্ধার হয় ফেলে যাওয়া মালপত্র। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি)-এর হাতে তুলে দেওয়া হয় বেওয়ারিশ মাল। তেমনটাই হয় এবারও।

ব্যাগ খুলে যে অবর্ণনীয় দৃশ্য দেখেন জিআরপি কর্মীরা, তাই নিয়েই আজকের মামলা। ব্যাগের ভেতর একটি উলঙ্গ শিশুর মৃতদেহ, বয়স বড়জোর এক, হয়তো কিছু বেশি। দেহে পচন ধরেছে, তবে শনাক্ত করা যাবে না এমন নয়।

মুশকিল হল, শনাক্ত করবে কে? জিআরপি-র তরফে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা দায়ের হওয়ার পর শুরু হল তন্নতন্ন খোঁজ। বলা বাহুল্য, কাজটা সহজ নয়। সেকেন্দ্রাবাদ থেকে হাওড়া পর্যন্ত প্রতিটি স্টেশনে খবর পাঠানো হয়, যোগাযোগ করা হয় তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেকটি পুলিশ ইউনিটের সঙ্গে।

কখনও কখনও খড়ের গাদা থেকেও ছুঁচ মেলে। অন্ধ্রপ্রদেশের গুনটুর জেলার তেনালি থেকে খবর আসে, জিশান আহমেদ নামে একটি দেড় বছরের শিশুর ব্যাপারে ‘মিসিং ডায়েরি’ জমা হয়েছে স্থানীয় থানায়, দায়ের করেছেন তার দিদিমা। আরও কিছু খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, শিশুটির মায়ের নাম হাসিনা সুলতানা (২৪), বৈবাহিক অশান্তির কারণে স্বামীর সঙ্গে না থেকে ছেলেকে নিয়ে তেনালিতে নিজের মায়ের কাছে আছেন এক বছর ধরে।

২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর সন্ধ্যাবেলা জিশানকে নিয়ে বেরোন হাসিনা, কিন্তু মায়ের বাড়িতে আর না ফিরে দেখা করেন ওই এলাকারই বাসিন্দা ২৮ বছরের শেখ ভান্নুর শা-এর সঙ্গে। দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল হাসিনার বিয়ের আগে থেকেই, হাসিনা এলাকায় ফিরে আসায় পুনরায় চালু হয় সম্পর্ক। সেই সন্ধ্যার পর দুজনে হায়দ্রাবাদের বানজারা হিলস এলাকায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন।

ওদিকে মেয়ে এবং নাতি ফিরছে না দেখে অবশেষে ২৯ ডিসেম্বর থানায় অভিযোগ জানান হাসিনার মা। তবে ২৭ জানুয়ারি ফিরে আসেন হাসিনা, জানান, ছেলেকে রেখে এসেছেন এক ‘বন্ধুর’ বাড়িতে। অভিযোগপত্রে জমা দেওয়া শিশুটির ছবির সঙ্গে মৃত শিশুর চেহারার যথেষ্ট মিল। সুতরাং আর দেরি না করে তেনালি অভিমুখে রওনা দেন মামলার তদন্তকারী অফিসার সাব-ইনস্পেকটর স্বপন দাশ (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত)। সেখানে পৌঁছে হাসিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে, এবং জিশানের মৃত্যুর আড়ালে ভয়াবহ কাহিনীর বিবরণ সংগ্রহ করতে বেশি সময় লাগেনি তাঁর।

মর্মান্তিক সেই কাহিনীর বিশদে যেতে চাই না আমরা, বোধহয় শুনতে চাইবেন না আপনারাও। সংক্ষেপে বলি, মায়ের প্রেমের পথে ‘বাধা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই ছিল জিশানের অপরাধ। তাই জলে মেশানো বিষাক্ত বড়ি খাইয়ে তাকে হত্যা করে হাসিনা এবং ভান্নুর, ছোট্ট দেহ ব্যাগে ভরে রেখে দেয় দূরপাল্লার ট্রেনের সিটের নীচে। ট্রেনে ব্যাগ নিয়ে ওঠার দৃশ্য ধরা পড়ে সেকেন্দ্রাবাদ স্টেশনের সিসিটিভি ক্যামেরায়।

গ্রেফতার হয় হাসিনা এবং ভান্নুর, চার্জশিটও জমা পড়ে সময়মত। তারপর শুরু হয় আট বছরের বিচারপর্ব চলাকালীন দুজনকে পুলিশি হেফাজতে রাখার অক্লান্ত লড়াই। সেই লড়াই শেষ হয়েছে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি, বিরলতম এই মামলায় মাননীয় ফাস্ট ট্র্যাক (ফার্স্ট কোর্ট)-এর সেশনস বিচারপতি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন হাসিনা এবং ভান্নুরকে।

বিচার পেয়েছে ছোট্ট জিশান। আমাদের এটুকুই প্রাপ্তি।”
সৌজন্যে: কলকাতা পুলিশ

সর্বশেষ সংবাদ

জনপ্রিয় গল্প

সর্বশেষ ভিডিও